হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক: শরয়ী সমস্যা ও শর্তসাপেক্ষে তার সমাধান – মুফতি জিয়াউর রহমান

0
40

ইসলাম মানবতার ধর্ম৷ ইসলাম মানুষের কল্যাণ হয় এমন বিধানই আরোপিত করে৷ চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, একটি নবজাতক শিশুর জন্যে মায়ের দুধের বিকল্প কিংবা সমকক্ষ কখনোই হতে পারে না৷ তাই ইসলাম এই অনুমতি দিয়েছে যে, একটি শিশুকে আপন মা ছাড়াও অন্য নারী দুধ পান করাতে পারবে৷ তবে যে নারী ওই শিশুকে দুধ পান করাবে, ওই নারী সে শিশুর দুধ-মা হয়ে যাবে৷ বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে আপন মায়ের ন্যায় দুধ-মায়ের জন্যেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে৷ তাই তো আপন মায়ের ন্যায় দুধ-মায়ের সঙ্গে পর্দা করতে হয় না৷ দুধ-মার স্বামী দুধপানকারী শিশুর দুধ-পিতা হয়ে যায়৷

কুরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে-
وَإِنْ أَرَدتُّمْ أَن تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم مَّا آتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ
আর যদি তোমরা কোন ধাত্রীর দ্বারা নিজের সন্তানদেরকে দুধ খাওয়াতে চাও, তাহলে যদি তোমরা সাব্যস্তকৃত প্রচলিত বিনিময় দিয়ে দাও তাতেও কোন পাপ নেই৷ (সুরা বাকারা: ২৩৩)

দুনিয়ার ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পানের একমাত্র পদ্ধতি চলে আসছিল যে, নবজাতক শিশু তার মায়ের কিংবা ধাত্রী নারীর দুধ পান করবে সরাসরি তার বুক থেকে৷ কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে আরেকটি পদ্ধতি সামনে এলো যে, যে সমস্ত মায়ের বুকে দুধ রয়েছে, কিন্তু সন্তান মারা যাওয়ার কারণে সেই দুধ পান করার মতো অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই, ওই নারীদের দুধ একটি সংরক্ষিত জায়গায় সংরক্ষণ করা হবে৷ সেখান থেকে যে সমস্ত নবজাতকের দুধ পানের ব্যবস্থা নেই মা মারা যাওয়ার কারণে কিংবা মা সন্তানকে ফেলে যাওয়ার কারণে, তাদেরকে ওই সংরক্ষিত দুধ পান করানো হবে৷ এতে করে শিশুদের বুকের দুধের প্রয়োজন পুরা হবে৷ অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুমৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার কমে আসবে৷

আপাতদৃষ্টিতে পদ্ধতিটি সুন্দর এবং কল্যাণকর মনে হলেও বড় একটি শরয়ী সমস্যা হলো, একজন শিশু যখন এই ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ থেকে দুধ পান করবে, তখন সাথে সাথে এই ব্যাংকে যত নারীর দুধ রাখা রয়েছে, সবাই তার দুধ-মা হয়ে যাবে৷ এ সবাই দুধ-মা হয়ে যাওয়ার কারণে আপন মা-বাবার যে সমস্ত আত্মীয়ের সঙ্গে এই শিশুর বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম রয়েছে, ঠিক এই সমস্ত অজ্ঞাত দুধ-মা-বাবার আত্মীয়দের সঙ্গেও বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হয়ে যাবে৷

তাহলে দেখা যাচ্ছে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই শিশুর বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া সত্ত্বেও এই সমস্ত দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয় অজ্ঞাত হওয়ার কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে৷ এবং বাস্তবেও এমন বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম হবে, যেখানে দুধ সম্পর্কের কারণে বিবাহ হারাম হওয়া সত্ত্বেও অবৈধ বিবাহ হবে৷ বিবাহ অবৈধ হওয়ার কারণে সমাজ অবৈধ সন্তানে সয়লাব হয়ে যাবে৷

ইসলামের বিধান হচ্ছে, কোনো দুধের শিশু যদি দুধপানের মেয়াদ ২ বছর বয়সের ভেতর কোনো নারীর দুধ পান করে, তাহলে ওই নারী ওই শিশুর দুধ-মা হয়ে যাবে৷ বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়ার ব্যাপারে আপন মায়ের মতো দুধ-মায়ের সঙ্গেও তেমন সম্পর্ক স্থাপন হয়ে যায়৷ বংশীয় সম্পর্কের যাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম, ঠিক তদ্রূপ দুধ সম্পর্কের ওই সমস্ত আত্মীয়দের সঙ্গেও বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম৷ অল্প দুধ পান করুক বা বেশি, একবার পান করুক বা একাধিকবার, সর্বাবস্থায় বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হয়ে যায়৷ তবে এই দুধ পান করা শিশু অবস্থায় হতে হবে৷
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

وَأُمَّهَاتُكُمُ اللاَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ
(তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে) তোমাদের সে মাতা যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে ও তোমাদের দুধবোন৷ (সুরা নিসা: ২৩)

হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ الْوِلاَدَةِ ‏”‏

অর্থ: দুগ্ধ সম্পর্ক সেসব লোকদের হারাম করে দেয়, যাদের জন্মগত সম্পর্ক হারাম করে। (সহিহ মুসলিম: ৩৪৩৪)

তবে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে’ দুধ সংরক্ষণ করা এবং সেখান থেকে শিশুর দুধ পান করানো কয়েকটি শর্তে বৈধতা দেয়া যায়৷

এক. মায়েদের থেকে দুধ সংরক্ষণ করতে হবে পরিপূর্ণ পর্দা রক্ষা করে৷ এবং এমন সংরক্ষিত স্থানে, যেখানে পুরুষের প্রবেশাধিকার কিংবা হস্তক্ষেপ থাকবে না৷

দুই. মায়ের দুধ ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না৷ সম্পূর্ণ মানবতার কল্যাণ চিন্তাকে সামনে রেখে এই কার্যক্রম আঞ্জাম দিতে হবে৷ বাণিজ্যিক চিন্তা নিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করলে পুরো কার্যক্রমই অবৈধ এবং হারাম বলে গণ্য হবে৷

তিন. যেহেতু আপন মা-বাবার ন্যায় দুধ সম্পর্কের কারণেও বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হয়ে যায়, তাই হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জন্যে জরুরি হলো, তারা মায়েদের দুধ সংগ্রহ করবে পৃথক পৃথকভাবে এবং পরিচিতিসহ পৃথকভাবে দুধ সংরক্ষণ করে রাখবে৷ এবং শিশু যে নারীর দুধ পান করবে, তার পরিচয় ও ঠিকানা তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবে, যাতে দুধ পানকারী শিশুর পরিবারের সঙ্গে এই দুধ-মায়ের আত্মীয়তার যোগসূত্র স্থাপন হয় এবং উভয় পরিবারে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন না হয়৷

চতুর্থ আরেকটি বিষয় পরামর্শ আকারে বলব যে, মায়ের দুধের বড় একটা প্রভাব শিশুর উপর পড়ে, তাই কোনো চরিত্রহীনা নারীর দুধ যেন নবজাতক শিশু পান না করে, অভিভাবকদেরকে সেদিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে৷

এই শর্তগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে৷ পূরণ না করলে এই কার্যক্রমের বৈধতা দেয়া যাবে না৷ বিভিন্ন বিষয়ে দেখা যায়, উলামায়ে কেরাম শর্তারোপ করে জায়েয বলেন, কর্তৃপক্ষও সেটা মেনে নেয়, কিন্তু পরবর্তিতে শর্ত পূরণ না করেই তার কার্যক্রম চালিয়ে যায়৷ এটা অবশ্যই দুঃখজনক৷ তাই হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক স্থাপন নাজায়েয হওয়ার যে মতামত শীর্ষ উলামায়ে কেরাম দিয়েছেন, সেটার উপরই আপাতত সবাই একমত থাকা উচিত৷

লিখেছেন – মুফতি জিয়াউর রহমান হাফি.