সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা -মুফতি জিয়াউর রহমান

0
271

আগামী ২৬ ডিসেম্বর দেখা যাবে বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ। বাংলাদেশ থেকে এই মহাকাশীয় ঘটনাটি আংশিক দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছেন মহাকাশ বিষয়ক বিজ্ঞানীরা৷ তবে এবারের সূর্যগ্রহণে একটু ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যাবে৷ গ্রহণের সময় সূর্যের চারপাশে আগুনের গোলক দৃশ্যমান হবে৷ একে বলা হয় ‘‘রিং অব ফায়ার’’ বা অগ্নিগোলক। সর্বশেষ ১৭২ বছর আগে এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিল পৃথিবীবাসী।

এখন আসি সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে, সেই আলোচনায়-

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَمَا نُرْسِلُ بِالاٌّيَاتِ إِلاَّ تَخْوِيفًا.
অর্থ: আমরা ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নিদর্শনাবলি প্রেরণ করি৷ (সুরা ইসরা: ৫৯)

চন্দ্র, সূর্য, এই আসমান, জমিনসহ সমস্ত মাখলুকাত আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি৷ সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহ তাআলার কুদরতের দুটি অন্যতম নিদর্শন৷ মোটকথা সবকিছুই আল্লাহ তাআলার অপার কুদরতের নিশানা৷

জাহিলিয়াতের যামানায় লোকেরা মনে করত বড় কোনো ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে মনে হয় সূর্যগ্রহণ লাগে৷ মুগিরা ইবনু শু’বা রাযি, থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর দিনটিতে সুর্যগ্রহণ হলো। তখন আমরা সকলে বলাবলি করছিলাম যে, নাবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই এমনটা ঘটেছে। আমাদের কথাবার্তা শুনে রাসুল ﷺ বললেন:
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آياتِ اللهِ، لاَ يَنْخَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذلِكَ فَادْعُوا اللهَ وَكَبِّرُوا وَصَلُّوا وَتَصَدَّقُوا
অর্থ: সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ করবে। তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে এবং সলাত আদায় করবে ও সাদাকা প্রদান করবে। (বুখারি ও মুসলিম৷)

আবু মুসা রাযি. থেকে বর্ণিত:
خَسَفَتِ الشَّمْسُ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَامَ فَزِعًا يَخْشَى أَنْ تَكُونَ السَّاعَةُ حَتَّى أَتَى الْمَسْجِدَ فَقَامَ يُصَلِّي بِأَطْوَلِ قِيَامٍ وَرُكُوعٍ وَسُجُودٍ مَا رَأَيْتُهُ يَفْعَلُهُ فِي صَلاَةٍ قَطُّ ثُمَّ قَالَ: إِنَّ هَذِهِ الآيَاتِ الَّتِي يُرْسِلُ اللَّهُ لاَ تَكُونُ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُرْسِلُهَا يُخَوِّفُ بِهَا عِبَادَهُ فَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْهَا شَيْئًا فَافْزَعُوا إِلَى ذِكْرِهِ وَدُعَائِهِ وَاسْتِغْفَارِهِ ‏
অর্থ: নবি কারিম ﷺ এর যামানায় একবার সূর্যগ্রহণ লাগল। তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কিয়ামাত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। অবশেষে তিনি মাসজিদে এসে নামাযে দাঁড়ালেন এবং সবচেয়ে লম্বা কিয়াম, লম্বা রুকূ, লম্বা সিজদাহ সহকারে নামায আদায় করতে লাগলেন। আমি কখনও কোন নামায তাঁকে এত লম্বা করতে দেখি নি। নামায শেষ করে তিনি বললেন, এসব নিদর্শনাবলী যা যা আল্লাহ জগতে পাঠান, কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা জীবনের কারণে অবশ্যই তা হয় না। বরং আল্লাহ এগুলো পাঠিয়ে বান্দাদের সতর্ক করেন। অতএব তোমরা যখন এমন কিছু দেখতে পাও, তখন তোমরা ভীত হয়ে আল্লাহর যিকর, দু‘আ ও ইস্তিগফারে মশগুল হও। (সহিহ মুসলিম: ১৯৮৬)

উপরোক্ত হাদিস থেকে বোঝা গেলো সূর্য বা চন্দ্র আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে দুটি নিদর্শন৷ আর তা গ্রহণ লাগা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই হয়৷ তাদের নিজস্ব কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই৷ আল্লাহ তাআলার হুকুমের অধিনেই তাদের চলাচল এবং কার্যক্রম৷

হাদিসদ্বয় থেকে সূর্যগ্রহণ লাগলে আমাদের পালনীয় আমল সম্পর্কেও জানতে পারলাম৷ সে সময় দুআ করা, তাসবীহ পাঠ করা, তাওবা-ইস্তেগফার করা, নামায আদায় করা ও সাদাকা দেওয়া কর্তব্য৷ তাছাড়া এ সময় অনর্থক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা ছেড়ে অন্তরে ভয় জাগ্রত রাখাও কর্তব্য৷ কেননা হাদিসে এসেছে এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে সতর্ক করেন৷ ভয় প্রদর্শন করেন৷ তাই আল্লাহর প্রকৃত বান্দারা এ সময় আল্লাহর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন৷ বিভিন্ন হাদিস থেকে রাসুলে আকরাম ﷺ থেকে এ সময় উপরোক্ত আমলগুলো প্রমাণিত৷ মোটকথা ‘গ্রহণ’কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় বলে গণ্য করা হয়েছে। এ জন্যে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন এ সময় অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ, দোয়া, সালাত আদায় প্রভৃতি আমলে মাশগুল থাকে।

সূর্যগ্রহণের নামায

রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে সালাতুল কুসুফ তথা সূর্যগ্রহণের নামায সম্পর্কে অনেকগুলো সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে৷ তাই এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, সালাতুল কুসুফ তথা সূর্যগ্রহণের নামায সুন্নাত৷ জামাতের সঙ্গে আদায় করাও সুন্নাত৷

সালাতুল কুসুফের সময়:

আবু বাকরাহ রাযি. বলেন-
كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَانْكَسَفَتْ الشَّمْسُ فَقَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجُرُّ رِدَاءَهُ حَتَّى دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَدَخَلْنَا ، فَصَلَّى بِنَا رَكْعَتَيْنِ حَتَّى انْجَلَتْ الشَّمْسُ ، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لا يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَصَلُّوا وَادْعُوا حَتَّى يُكْشَفَ مَا بِكُمْ
একবার আমরা রাসুল ﷺ এর কাছে থাকাকালে সূর্যগ্রহণ শুরু হলো। তখন রাসুল ﷺ উঠে দাঁড়ালেন এবং পরিহিত চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের নিয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং গ্রহণ ছেড়ে গেলো। তিনি বললেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কারো মৃত্যুর কারণে কখনও সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন গ্রহণ দেখবে তখন অবস্থাটি থাকা পর্যন্ত সালাত আদায় করবে এবং দোয়ায় মগ্ন থাকবে। (সহীহ বুখারী)

এই হাদিস থেকে বোঝা গেলো, সালাতুল কুসুফ তথা সূর্যগ্রহণের নামাযের ওয়াক্ত হলো, গ্রহণ লাগা থেকে নিয়ে গ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত৷ তাই যথাসম্ভব সালাতুল কুসুফ দীর্ঘ হওয়া চাই৷ রাসুলুল্লাহ ﷺ কুসুফের নামায দীর্ঘ কেরাত, দীর্ঘ রুকু, দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে আদায় করতেন৷

সালাতুল কুসুফের নিয়ম:

সালাতুল কুসুফ তথা সূর্যগ্রহণের নামায ২ রাকাত৷ অন্য সাধারণ নামাযের মতই এই নামায আদায় করতে হয়৷ যদিও প্রতি রাকাতে ২ রুকু, ৩ রুকু এমনকি ৪ রুকুর মাধ্যমে ব্যতিক্রমী নিয়মে এই নামায পড়ার বিবরণও এসেছে৷ কিন্তু হানাফী মাযহাবে সাধারণ নিয়মে ২ রাকাত নামায আদায়ই বিধেয়৷ দলিল এবং যুক্তির আলোকে এটাই অধিক গ্রহণযোগ্য৷

আযান-ইকামত ছাড়া মাকরূহ ওয়াক্ত ব্যতিত মসজিদে এই নামায জামাতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নাত৷ তবে দিনের নামায হওয়ার কারণে কিরাত আস্তে পড়াই নিয়ম৷ হাদিস এবং যুক্তির আলোকেই এটাই বাস্তবসম্মত৷ সাহাবি হযরত জাবির ইবনে সামুরা রাযি. বলেন-

صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي كُسُوفِ الشَّمْسِ رَكْعَتَيْنِ، لَا نَسْمَعُ لَهُ فِيهِمَا صَوْتًا.

অর্থ: রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের নিয়ে ২ রাকাত সূর্যগ্রহণের নামায পড়লেন, কিন্তু উভয় রাকাতে আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে কোনো আওয়াজ শুনি নাই৷
(আবু দাউদ: ১১৮৪, নাসাঈ: ১৪৮৪, তিরমিযী: ৫৬২, ইবনে মাজাহ: ১২৬৪)

كُنْتُ إِلَى جُنُبِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ كُسِفَتِ الشَّمْسُ، فَلَمْ أَسْمَعْ لَهُ قِرَاءَةً.
অর্থ: আমি সূর্যগ্রহণের দিন রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পাশে দাঁড়িয়েছি (নামায আদায় করেছি), কিন্তু রাসুল ﷺ থেকে কিরাত শুনি নি৷ (তাবারানী: ১১৬১২)

এখান থেকে বোঝা গেলো সালাতুল কুসুফে কিরাত আস্তে হবে৷ তবে সশব্দে কিরাত পড়াও জায়েয আছে৷

সালাতুল কুসুফে ‘গ্রহণ’ শেষ হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ নামায পড়া সুন্নাত৷ তবে গ্রহণ শেষ হবার আগে নামায শেষ করে নেয়াতেও কোনো সমস্যা নেই৷ তবে বাকি সময়টুকু যিকির, দুআ, ইস্তেগফার করে কাটানো উচিত৷

চন্দ্রগ্রহণের নামায

রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে চন্দ্রগ্রহণের নামাযও প্রমাণিত রয়েছে৷ তবে হানাফী মাযহাব মতে সালাতুল খুসুফ জামাতের সঙ্গে নয়, বরং একাকি নিজ ঘরে পড়াই নিয়ম৷ তাই চন্দ্রগ্রহণের সময় আমাদেরও নিজ নিজ ঘরে একাকি চন্দ্রগ্রহণের নামায আদায় করা উচিত৷ এবং এটা সুন্নাতও৷
ﺃَﻣَّﺎ ﻓِﻲ ﺧُﺴُﻮﻑِ ﺍﻟْﻘَﻤَﺮِ ﻓَﻴُﺼَﻠُّﻮﻥَ ﻓِﻲ ﻣَﻨَﺎﺯِﻟِﻬِﻢْ؛ ﻟِﺄَﻥَّ ﺍﻟﺴُّﻨَّﺔَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻥْ ﻳُﺼَﻠُّﻮﺍ ﻭُﺣْﺪَﺍﻧًﺎ
অর্থ: চন্দ্রগ্রহণের সময় ঘরে নামায আদায় করা হবে৷ কেননা সুন্নাহ হচ্ছে, তখন একাকি নামায পড়া৷ (বাদায়েউস সানায়ে’: ১/২৮২)

নারীদের করণীয়:

নারীরাও সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় ঘরে একাকি নামায আদায় করবেন৷ গ্রহণের বাকি সময়টুকু যিকর-আযকার ও তাসবিহ-তাহলিলে মাশগুল থাকবেন৷

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ-কেন্দ্রিক কুসংস্কার

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে কিছু কুসংস্কার, বিভ্রান্তি ও অমূলক ধারণা রয়েছে৷ ‘এ সময় খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না’৷ ‘গর্ভবতী মায়েরা ঘরের কাজকর্ম করতে পারবে না’৷ সমাজে আরো নানা রকমের কুসংস্কারমূলক কথা প্রচলিত রয়েছে৷ মূল কথা হচ্ছে, চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতী মায়েদের ভয় কিংবা আশঙ্কার কিছু নেই৷ অন্যদিনের মতো পানাহারসহ স্বাভাবিক সব কাজকর্ম করতে পারবেন৷ লোকমুখে যা শোনা যায়, সব ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কার৷

‘গ্রহণ’কে ঘিরে এমন বিশ্বাসও রয়েছে, যে কথাগুলোর উপর বিশ্বাস রাখলে ঈমানের ক্ষতি হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে৷ মোটকথা এ সময় শরীয়ত কারো জন্যে কোনো বাধ্যবাধকতা বা কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করে নি৷ তাই এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বেঁচে থাকা সবার জন্যে কর্তব্য৷