মাওলানা সা’দ সাহেবের যত ভুল!

0
3705

মাওলানা সাদ বলেন :
১. ‘শুধু সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর মুজাহাদার পদ্ধতিকেই দাওয়াত বলে।’ ‘আমার মতে, এছাড়া অন্য কোনো তরিকাই দাওয়াতের তরিকা নয়।
২. ‘বর্তমান যুগের রেওয়াজি তরিকাগুলো সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর যুগে ছিল না যে, সুযোগ এলো তো পত্র-পত্রিকায় এক কলাম লিখে দিলাম।
এই রেওয়াজি পদ্ধতিগুলোর কারণে রুসুম- রেওয়াজের প্রসার ঘটবে; কিন্তু এর মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার-প্রসার হবে না।’ [সিতাপুর ইজতিমায় প্রদত্ত ভাষণ। উদ্ধৃতি-একটি খোলা চিঠি : ১১]
৩. দাওয়াতের জন্যে ‘যারা রেওয়াজি পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করে তাদের মস্তিষ্ক ইহুদি-খ্রিস্টান প্রভাবিত। [সিতাপুর ইজতিমায় প্রদত্ত ভাষণ। উদ্ধৃতি-একটি খোলা চিঠি : ১৩]
৪. ‘প্রত্যেককে মসজিদে এনে দ্বীনের কথা বলাই সুন্নত। মসজিদের বাইরে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত তো সুন্নতের পরিপন্থী।…
মসজিদের বাইরের পরিবেশ গাফলতির পরিবেশ। সেখানে দ্বীনের কথা বলার অর্থ দ্বীনের অবমাননা করা। [সাদ সাহেবের কাছে আকাবির হযরতের ১১ মার্চ ২০১৫ তারিখে লেখা চিঠি। উদ্ধৃতি, মজমুআয়ে খুতুত]
৫. ‘মসজিদে ঈমানের আসর কায়েম করা ফরয, ফরয।’
৬. ‘মসজিদের বাইরে অন্য কোথাও হিদায়াত পাওয়া যাবে না।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৫]
৭. ‘দ্বীনের ওই সকল শাখা, যেখানে শুধু দ্বীনই পড়ানো হয়, যদি সেগুলোর সম্পর্কও মসজিদের সঙ্গে না থাকে তাহলে আল্লাহর কসম! সেখানেও দ্বীন থাকবে না। সেখানে দ্বীনের পাঠদান থাকবে; কিন্তু দ্বীন থাকবে না।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৫]
৮. ‘দাওয়াত ও ইবাদত দুটোকেই একত্র করো।’ ‘কারণ, যে ব্যক্তি দাওয়াতের আমল না করে শুধু ইবাদতে ব্যস্ত থাকবে সে ইবাদতের মাঝে কীভাবে উন্নতি করবে!’
৯. ‘তাওবা পূর্ণ করা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনেই নকল ও হরকত’। মানুষ তাওবার তিনটি শর্তের কথা জানে।… চতুর্থ শর্তের কথা জানে না। ভুলে গেছে। সেটা হলো, খুরুজ (আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া)। ৯৯ জনকে হত্যাকারী খুনী লোকটির একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সন্ন্যাসী তাকে আশাহত করে। এরপর একজন আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাকে বলেন, তুমি অমুক বস্তির দিকে খুরুজ করো। লোকটি বের হয়। আল্লাহর কুদরত, তখনই লোকটি মৃত্যুবরণ করে। তার রূহ কবয করার জন্যে রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতা- দু’জনই আসে। অবশেষে লোকটির তাওবা কবুল হয়।’ [সিতাপুর ইজতিমায় প্রদত্ত ভাষণ। উদ্ধৃতি-একটি খোলা চিঠি : ২১]
১০. ‘মুসা আলাইহিস সালাম নিজের কওমের মাঝে দাওয়াতের কাজ ছেড়ে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্যে নির্জনবাসে চলে গিয়েছিলেন। যার ফলে ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার বনি ইসরাঈল গুমরাহ হয়ে যায় (মুরতাদ হয়ে যায়)। ওই সময় প্রধান ছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম।তিনিই মূল যিম্মাদার ছিলেন।হারুন আলাইহিস সালাম তো স্রেফ সহকারী ও সহযোগী ছিলেন। মূল যিম্মাদারের অবস্থান করা দরকার ছিল।’ [সিতাপুর ইজতিমায় প্রদত্ত ভাষণ।উদ্ধৃতি-একটি খোলা চিঠি : ২১]
১১. ‘মানুষ জিজ্ঞেস করে, তোমার আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক কার সঙ্গে? তুমি বলে দাও, আমার আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক দাওয়াতের সঙ্গে।’ ‘যে ব্যক্তি দাওয়াতের মেহনতে যুক্ত থেকেও নিজের আত্মশুদ্ধির জন্যে কোনো বুযুর্গের সংস্পর্শের প্রয়োজন অনুভব করে সে আসলে দাওয়াতকে বুঝতেই পারেনি।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৭]
১২. ‘যে ব্যক্তি এই ছয় নম্বরকে পূর্ণ দ্বীন মনে করে না, সে হলো ওই ব্যবসায়ীর মতো, যে নিজেই নিজের দধিকে টক বলে বেড়ায়। এমন ব্যবসায়ী কখনো সফল
হতে পারে না।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৭]
১৩. ‘যেসমস্ত আলেম আমলিভাবে দাওয়াতের মেহনতের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাদের কথা কখনই আমলে নেবে না এবং তাদের কাছে কোনো মাসআলাও জিজ্ঞেস করবে না।’
১৪. ‘তাবলীগে বের হওয়া, এটা দ্বীন শেখার জন্যে নয়। দ্বীন শেখার জন্যে তো আরো অনেক পদ্ধতি রয়েছে। তাবলীগে বের হওয়া, এটা দ্বীনের একটি স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য।’
১৫. ‘হিদায়াত যদি আল্লাহর হাতেই থেকে থাকে তাহলে তিনি কেন নবীদের প্রেরণ করেছেন!’ [নাউযুবিল্লাহ]
১৬. ‘মুজিযা নবী আলাইহিস সালামের সত্ত¡র সঙ্গে বিশেষায়িত নয়।’ এই মুজিযা দাওয়াতের কারণে ঘটে।
১৭. তিনি নিজেকে বর্তমান সময়ের সমস্ত উম্মাহর এমন আমির (খলিফাতুল মুসলিমিন) মনে করেন, যার আনুগত্য করা ওয়াজিব। কেউ তার আনুগত্য না করলে তাকে তিনি জাহান্নামি সাব্যস্ত করে থাকেন। এ কারণেই তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের আমির। যে আমাকে আমির বানবে না সে জাহান্নামে যাবে।’
১৮. ফুকাহায়ে কেরাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদিনের ইজতিহাদ ও উদ্ভাবনের ওপর তিনি কোনো আস্থাই রাখেন না। এর কয়েকটি উদাহরণ দেখুন,
১৯. ‘আমার মতে ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল পকেটে রেখে নামায পড়লে নামায হবে না। তোমরা আলেমদের কাছ থেকে যত ইচ্ছা ফতোয়া নাও।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৬]
২০. ‘ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল থেকে দেখে দেখে কুরআন শোনা ও পড়া হারাম। এতে কুরআনের অবমাননা হয়। এর কারণে কোনো সাওয়াব হবে না।’ ‘যেসমস্ত আলেম তা জায়েয হওয়ার ফতোয়া দেয় তারা উলামায়ে সু। তাদের অন্তর ও মস্তিষ্ক ইহুদ-নাসারা প্রভাবিত। তারা বিলকুল অজ্ঞ।’ ‘আমার মতে, যে আলেম তা জায়েয হওয়ার ফতোয়া দেয় তার অন্তর আল্লাহর বড়ত্ব থেকে শূন্য।’ ‘চাই তার বুখারি মুখস্থ থাকুক। বুখারি তো অমুসলিমদেরও মুখস্থ থাকে। [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৬]
২১. ‘কুরআন বুঝে পড়া প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব, ওয়াজিব।’ ‘না বুঝে কুরআন পড়ার কারণে কোনো ফায়দা হবে না। এমন লোকের ওয়াজিব তরকের গুনাহ হবে।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৭]
২২. ‘মোবাইলে কুরআন পড়া আর পেশাবদানিতে দুধ পান করা একই কথা।’
২৩. তার মতে, ‘হানাফি মাযহাব অনুসারে নামাযের তাকবিরাতে ইনতিকালিয়্যাহ পড়া সুন্নাত’ এই হুকুমের কারণে নামাযের মাঝে উদাসীনতা সৃষ্টি হয়। অন্য ইমামগণ এই হুকুমের ক্ষেত্রে আরো কঠোরতা দেখিয়েছেন, সেটাই সঙ্গত।
২৪. ‘বিনিময় নিয়ে কুরআন কারিম পড়া নোংরা নারীর বিনিময়ের মতো। নোংরা নারী তার আগে জান্নাতে যাবে।’ [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৬]
২৫. ‘ধ্যান ছাড়া আল্লাহর যিকিরকারী গুনাহগার।’ ‘এর কারণে আল্লাহর নৈকট্য নয়; বরং দূরত্ব সৃষ্টি হয়।’
২৬. ‘সাহাবায়ে কেরাম রাদি. ঈমান আনয়নের পর মদিনা থেকে ফিরে নিজের এলাকায় যাওয়াকে ইরতিদাদ-ধর্মত্যাগ মনে করতেন।’ ‘কাজেই (নিযামুদ্দিন) মারকায থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে মামুলি বিষয় মনে কর না।’
২৭. ‘আসহাবে কাহাফের সঙ্গী জন্তুটি কুকুর ছিল না; বাঘ ছিল, বাঘ।’ কথাটি তিনি রুজুর পরও বলেছিলেন। [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ বাদ মাগরিব, উদ্ধৃতি- অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৪৯]
২৮. বাংলাওয়ালি মসজিদে সমস্ত ফরয নামাযের পর নিয়মিত হাত উঠিয়ে দুআ করার প্রচলন নেই। এ কারণে প্রায়সময় তাকে দেখা যায়, তিনি মুনাজাত না করেই উঠে চলে যাচ্ছেন।
২৯. ‘প্রতিবাদ করার মাধ্যমে তারা চায় যে, তাদের পৃথক করে দেওয়া হোক যেন তাদের দাবি কার্যকর হয়। এরা ভেতর থেকে শয়তান। এটা আমি ভালো করেই জানি। আল্লাহর সত্তা খুবই অমুখাপেক্ষী। আমি ঢের জানি। আমি কথাগুলো আল্লাহর তরফ থেকে বলছি। আমি স-ব জানি।’ [তার এ দাবি খুবই বিপদজনক। এ কথা থেকে ওহি নাযিল হওয়ার গন্ধ অনুভূত হয়। নাউযুবিল্লাহ।]
৩০. তিনি দ্বীনের মেহনতের বিভিন্ন তরিকা এবং এ সম্পর্কে কোন পন্থা অবলম্বন করলে উপকার হবে, এ সম্পর্কে মেহনতের পুরনো সাথী, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দ্বীনদার সচেতন হযরতদের অভিমত নেওয়া ও তাদের কাছ থেকে মাশওয়ারা নেওয়ার মাধ্যমে উপকৃত হওয়াকেও শরিয়তের দৃষ্টিতে না-জায়েয, ভুল ও মন্দকাজ মনে করেন। নিজেকে এ ধরনের মাশওয়ারা থেকে অমুখাপেক্ষী মনে করেন। অথচ এই মাশওয়ারা রাসূলুল্লাহ সা. এর সুন্নাত এবং দ্বীনের মহান শিক্ষা।
তার বক্তব্য হলো, “দাওয়াতের মেহনতকে সরাসরি সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর সীরাত থেকে বুঝতে হবে। অতীত বা বর্তমানের মনীষীদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া ও তাদের আলোচনা করার অর্থ উঁচু স্তর থেকে নিচে অবতরণ করা।”
মাশওয়ারার আমলটি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন কারিম, হাদিসে রাসূল সা. ও সীরাতে রাসূল সা.-তিন জায়গাতেই কখনো ওয়াজিব, কখনো মুসতাহাব অভিহিত করে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অথচ তিনি সেই মাশওয়ারাকে খুবই গুরুত্বহীন মনে করেন। নিজেকে মাশওয়ারা থেকে অমুখাপেক্ষী মনে করেন। কেউ মাশওয়ারা দিলে তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। অথচ মাশওয়ারা না করলে আল্লাহর আযাবের কথা ইরশাদ হয়েছে।
আন্দোলনে পরিণত করেছেন।”
এরপর কিছু দিন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার এ ধরনের মন্তব্য খোদ তার নিজের জন্যেই মারাত্মক বিপদজনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কেননা এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে একসঙ্গে দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সংঘাতে নামা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তখন থেকে তিনি হযরত শায়খুল হাদিস রহ. এর নাম সযতনে এড়িয়ে শুধু তৃতীয় হযরতজি রহ.কে টার্গেট বানিয়ে প্রকাশ্যে নিজের বয়ানের মাঝে এ ধরনের মন্তব্য করে বেড়ানোর কাজ শুরু করে দেন।বিস্তারিত দেখুন
– মাওলানা যুবায়রুল হাসান কান্ধলভি রহ.
অব্যক্ত বেদনার অজানা ইতিহাস
তাবলীগ : ১০, পৃষ্ঠা : ১৩৷

৩১. তৃতীয় হযরতজি রহ. এর ইনতিকালের পর প্রথম কয়েক বছর মাঃ সাদের মুখে এ ধরনের কথা শোনা যেত যে, “এই দাওয়াতি মেহনতের দু’জন দুশমন রয়েছে, একজন হলেন শায়খুল হাদিস যাকারিয়া রহ. যিনি আমার দাদার গদি মৌলভি ইনআমকে দিয়েছেন। অপরজন মৌলভি ইনআমুল হাসান রহঃ, যিনি এই মেহনতকে
৩২. তিনি অলিদের পথ আর নবিদের পথ নামের অস্পষ্ট পরিভাষা তৈরি করে বিভিন্ন বয়ানে আলোচনা করে জনগণকে
এ ধোকা দিচ্ছেন যে, ‘আউলিয়ায়ে কেরাম- যারা যিকির ও শোগলের দীক্ষা প্রদান করে থাকেন তারা মূলত নবীদের আমলের বিপরীত কাজ করেন; অথচ মহান বযুর্গগণ যেই দরুদ-উযিফার দীক্ষা দিয়ে থাকেন, সেগুলো একান্তই ব্যক্তির আত্মশুদ্ধির জন্যে। এ কাজও নবীদের নবীওয়ালা দায়িত্বের অংশ। কুরআন কারিমে রাসূলুল্লাহ সা. এর তিনটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো,
১. কুরআন তিলাওয়াত
২. আত্মশুদ্ধি
৩. কিতাব ও হিকমাহর শিক্ষা।
অথচ মাওলানা সাদ সাহেব বলছেন, ‘একজন বুযুর্গ তার মুরিদকে যা যা করাতে চান, তার সবই এই রাস্তায় আছে।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘দাওয়াতের আমল ও ওলীওয়ালা আমলের মাঝে পার্থক্য শুধু খুরুজ না হওয়া।’ আরেক জায়গায় তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তার সংক্ষিপ্ত ভাষ্য হলো, ‘বুযুর্গরা যেসব অযিফা দিয়ে থাকেন যে, অমুক তাসবিহ এতো হাজার পড়ো, এতো লাখ পড়ো, এগুলো শরিয়তের কোথাও প্রমাণিত নেই। কাজেই শুধু সুন্নাতে বর্ণিত তাসবীহগুলোই গুরুত্ব সহকারে পালন কর।’
৩৩. তার মতে আল্লাহর রাস্তায় খুরুজ- বের হওয়া- এটি অন্যান্য ফরযের ওপরও অগ্রাধিকার পাবে। এজন্যেই তিনি বারবার বলেন, ‘নবী করিম সা. রমাযানে ফরয রোযা ভেঙেছেন; কিন্তু দাওয়াতের নকল ও হরকতের ব্যত্যয় ঘটতে দেননি।’
৩৪. ‘রমাযান মাসে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার কারণে যদি তারাবীহর কুরআন শোনার আমলও ছুটে যায় তাহলে আমার মতে এটি কুরআনের ক্ষেত্রে ত্রুটি হবে না।’ ‘অর্থাৎ এর কারণে কুরআন শোনার সুন্নতের লঙ্ঘন হবে না।
৩৫. ‘মাশওয়ারা ছেড়ে চলে যাওয়া জিহাদের ময়দানে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়ে যাওয়া থেকেও মারাত্মক।’ ‘আমার মতে, মাশওয়ারা [পরামর্শ] ছেড়ে চলে যাওয়া যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া থেকেও অধিক মারাত্মক অপরাধ।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭। বাদ মাগরিব, বাংলাওয়ালি মসজিদ। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩২]
৩৬. ‘মাশওয়ারা নামাযের মত’। ‘মাশওয়ারা নামায থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং নামায থেকে অধিক ব্যাপক।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭। বাদ মাগরিব, বাংলাওয়ালি মসজিদ। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩৩] মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি তার তাজা বয়ানে বলেছেন, ‘মাশওয়ারা নামাযের মতো অত্যাবশ্যক; বরং নামায থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যেভাবে নামাযের জন্যে মসজিদে আসা জরুরি, তদ্রুপ মাশওয়ারার জন্যে মসজিদে আসা জরুরি।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭। বাদ মাগরিব, বাংলাওয়ালি মসজিদ। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩৩]
৩৭. তিনি বলেছেন, ‘আযান হলো দাওয়াত। নামায হলো, গঠন। আর নামাযের পর আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া, এটি হলো, কর্মবিন্যাস।’ (তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়াটাই আসল কাজ। আযান ও নামায হলো সেই কাজের প্রস্তুতি মাত্র। একই কথা মওদুদি সাহেবও বলেছেন যে, নামায-রোযা-যাকাত সব আহকাম একটি আসল কাজের প্রস্তুতি ও অনুশীলনের জন্যে। সেটি হলো, এলাহি সরকার গঠন করা। অর্থাৎ এখানে মাধ্যমকে লক্ষ্য আর লক্ষ্যকে মাধ্যম সাব্যস্ত করা হয়েছে।)
৩৮. তিনি তার অনেকগুলো নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বারবার এ কথা বলে থাকেন যে, ‘এটি চুড়ান্ত কথা।’ ‘এ কথা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে চুড়ান্ত।’অথচ সেই কথা না কুরআনে আছে, না হাদিস শরিফে আছে। প্রশ্ন হলো, সে কথা যে আল্লাহর চুড়ান্ত বিধান, তা তিনি কীভাবে জানলেন! নাউযুবিল্লাহ, তিনি কি অহির মাধ্যমে জেনে বলছেন? যেমন, তিনি বলেছেন, ‘এ কথা আল্লাহর ফয়সালা যে, কিয়ামত পর্যন্ত এই বাংলাওয়ালি মসজিদই মারকায থাকবে।’ শুধু এটিই নয়; এমন আরো অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে তিনি এমন মন্তব্য করে থাকেন।
৩৯. ‘এই স্থানটির সম্মান কর। সমগ্র পৃথিবীর অবস্থা হলো এমন যে, মক্কা-মদিনার পরে যদি এমন কোনো সম্মানিত জায়গা থাকে, যেই জায়গাকে আদর্শ মনে করতে হয়, যে জায়গার অনুসরণ করতে হয়, যেই জায়গাকে মহান মনে করতে হয়, তাহলে সেটি হলো এই নিযামুদ্দিন বাংলাওয়ালি মসজিদ।’ তার এই বয়ান ইউটিউবে আছে।
৪০. ‘যে কোনো জটিলতা এখানে নিয়ে আসো। হযরত উমর রাদি. তাঁর যুগে কোনো মাসআলা মদিনার বাইরে নিয়ে যেতে
দিতেন না। মদিনার মারকাযি ভুমিকা বহাল রাখতেন। জনগণ বিরক্ত হয়ে পড়েছিল।’ ‘হযরত উসমান রাদি. এই বিধি-নিষেধ তুলে দেন।’ ‘মদিনার মারকাযি ভুমিকা বিনষ্ট করে ফেলেন। মদিনা থেকে খিলাফত ধ্বংস হওয়ার এটাই কারণ।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭। বাদ মাগরিব, বাংলাওয়ালি মসজিদ। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান ২৯]
৪১. ‘বুযুর্গগণ সুফি ছিলেন বটে; কিন্তু দ্বীনের সহায়তাকারী ছিলেন না। তাদের মেহনতের কারণে কারামত প্রকাশ পেতে পারে; কিন্তু নুসরত আসবে না। বুযুর্গগণ কারামতওয়ালা ছিলেন; মেহনতওয়ালা ছিলেন না।’ তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, বুযুর্গদের রাস্তায় চলা ও তাদের পথ অনুসরণ করা ভুল ও গুমরাহি। অথচ কুরআন কারিমে যেই চার রাস্তাকে ‘সিরাতে মুসতাকিম’ বলা হয়েছে, বুযুর্গদের রাস্তাও সেই চার তরিকার একটি।
৪২. ‘মুমিন যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নামায আদায় করে, গুরুত্বের সঙ্গে মাশওয়ারায় উপস্থিত থাকা এর চেয়েও অধিক জরুরি। কারণ, নামাযের সম্পর্ক ব্যক্তির নিজের সঙ্গে। যদি সে মসজিদের জামাতে না আসে,
ঘরেই আদায় করে তাহলে যদিও তার সাওয়াব কম হবে; কিন্তু ফরয দায়িত্ব পূর্ণ হয়ে যাবে। এর বিপরীতে সে যদি মাশওয়ারায় হাজির না হয় তাহলে তার মাশওয়ারায় না আসাটা দ্বীনের মেহনতকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। মহল্লার মাশওয়ারা হলে মহল্লা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। দেশের মাশওয়ারা হলে দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বৈশ্বিক বিষয়ের মাশওয়ারা হলে বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্থ হবে।’
৪৩. ‘এই মেহনতের মাঝে মাশওয়ারা নামায থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও নামায থেকে অধিক জনঘনিষ্ঠ।’
৪৪. ‘সবচেয়ে বড় ইজতিমায়ি আমল হলো মাশওয়ারা। কুরআন কারিম মাশওয়ারাকে নামাযের পাশাপাশি উল্লেখ করেছে। হজ, যাকাত ও রোযাকে নামাযের পাশাপাশি উল্লেখ করেনি।’
৪৫. ‘যেভাবে সবকিছু ছেড়ে নামাযের জন্যে নামায আদায়ের স্থান মসজিদে আসা জরুরি, তদ্রুপ মাশওয়ার জন্যে আসাও জরুরি। যেভাবে পৃথক নামায নেই, তদ্রুপ পৃথক মাশওয়ারা নেই। যেভাবে এক মসজিদে দু’ নামায নেই, এক নামাযেই অংশগ্রহণ করতে হয়, তদ্রুপ মাশওয়ারাও একটাই। নিজেদের মাশওয়ারাকে সুন্নাতের ওপর, সীরাতের ওপর উঠিয়ে আনো।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭]
৪৬. ‘সীরাতে মাশওয়ারা শুধু ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে পাওয়া যায়। কাজেই মাশওয়ারার ওপর গুরুত্ব দেওয়া চাই। দাওয়াতের আমলে মাশওয়ারার দরকার নেই। কেননা এটি তো মানসুস তথা অহির সুস্পষ্ট বর্ণনায় বিদ্যমান। [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭]
৪৭. ‘রাস্তায় বের না হয়ে দাওয়াত দেওয়া এটা তো সাহাবায়ে কেরামের যুগে অকল্পনীয় ছিল। অথচ এখন আমরা ধরে নিচ্ছি যে, আল্লাহর রাস্তায় বের না হয়েও দাওয়াত দেওয়া যায়। এমনকি তারা বের না হয়ে দাওয়াত দেওয়াকেও দাওয়াত মনে করছে। এদের বিপরীতে সাহাবায়ে কেরাম নকল-হরকত তথা রাস্তায় বেরুনোর ওপর শতভাগ বদ্ধপরিকর ছিলেন। এমন একজন সাহাবিও নেই, যিনি বের হননি। খুরুজ করেননি। এটাই চুড়ান্ত সত্য। [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ বাদ ঈশা, হায়াতুস সাহাবার তালিম, উদ্ধৃতি- অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩৬]
৪৮. ‘আল্লাহ তাআলার গায়বি সাহায্য এ রাস্তার নকল ও হরকতের ওপর নির্ভরশীল। ( কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন)।… যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান নিজে গিয়ে দাওয়াত না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার এই নির্দেশ
পূরণ হবে না। [সাম্ভাল ইজতিমায় প্রদত্ত বয়ান। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩৯]
৪৯. ‘দ্বীনের প্রচারের জন্যে মুসলিমরা নিজেই এই মেহনত নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, এটাই দ্বীনের প্রচারের মাধ্যম। অন্য কোনো মাধ্যমকে এর বিকল্প মনে করা অনেক বড় নির্বুদ্ধিতা। আল্লাহর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে দাওয়াত দেওয়া, এটাই মূল সুন্নত। এই মেহনত সুন্নতের সঙ্গে সাদৃশ্য নয়, বা সুন্নতের নিকটবর্তী নয়; বরং এটাই মূল সুন্নত।’ [সাম্ভাল ইজতিমায় প্রদত্ত বয়ান। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩৯]
৫০. “ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ ﻟِﻴَﻨﻔِﺮُﻭﺍْ ﻛَﺂﻓَّﺔً ﻓَﻠَﻮْﻻَ ﻧَﻔَﺮَ ﻣِﻦ ﻛُﻞِّ
ﻓِﺮْﻗَﺔٍ ﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻟِّﻴَﺘَﻔَﻘَّﻬُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺪِّﻳﻦِ ﻭَﻟِﻴُﻨﺬِﺭُﻭﺍْ ﻗَﻮْﻣَﻬُﻢْ
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই মুমিনদের মাঝে বাহ্যিকভাবে ওই সকল আলেম বা ওই সকল হযরত উদ্দেশ্য, যাদের ওপর উম্মতের অন্য কোনো শাখার যিম্মাদারি রয়েছে। আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা নিবেদন করছি। যদি এই আয়াত গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করা হয় তাহলে বুঝে আসবে যে, এই আয়াতের মাঝে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার
নির্দেশ ওই সকল হযরতকে দেওয়া হয়েছে, যাদের ওপর উম্মতের কোনো দ্বীনি দায়িত্ব রয়েছে। ‘এই রাস্তায় সবাই বের হবে না’ এমন কথা তো কোথাও নেই। উবাই ইবনে কা‘ব রাদি. ছিলেন শ্রেষ্ঠতম কারী। তার এক সাল ছুটে গিয়েছিল। এই এক বছর বের না হওয়ার অনুতাপে তিনি সবসময় দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকতেন। তার ওই বছর বের না হওয়ার কারণ হলো, জামাতের আমির নির্বাচিত করা হয়েছিল একজন কমবয়স্ক লোককে। তিনি তখন মনে করেছিলেন, এই আমিরের নেতৃত্বে
আমাকে মেহনত করতে হবে না। এই ভাবনার ফলে তিনি শুধু এক বছর খুরুজ করেননি। উবাই রাদি. বলেন, পরবর্তীকালে আমি সবসময় নিজেকে গাল-মন্দ করেছি, অনুশোচনা বোধ করেছি যে, যিম্মাদার ছোট না বড়, নতুন না পুরাতন তার সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক! [সাম্ভাল ইজতিমায় প্রদত্ত বয়ান। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৪০]
৫১. আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন,
” ﻭﺍﺫﻛﺮﻥ ﻣﺎ ﻳﺘﻠﻰ ﻓﻲ ﺑﻴﻮﺗﻜﻦ ﻣﻦ ﺁﻳﺎﺕ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﺤﻜﻤﺔ ”
‘আল্লাহর আয়াত ও হিকমাত থেকে যা তিলাওয়াত করা হয় তা তোমরা (মহিলারা) তোমাদের নিজ নিজ করে যিকির করো।’ তিনি এর ব্যাখ্যা করেছেন, ‘মহিলারা ঘরের ভেতর সম্মিলিতভাবে কুরআনের তিলাওয়াত ও আয়াতের মুযাকারাহ করবে।’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বাংলাওয়ালি মসজিদে বলেছেন। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৪৬] তিনি এ আয়াতের তাফসির করেছেন, মহিলারা সবাই সম্মিলিতভাবে তিলাওয়াত করবে ও কুরআনের আসর বানিয়ে মুযাকারাহ করবে।
৫২. ‘এখন তো পকেটে পকেটে মোবাইল বাজতে থাকে। আবার নামাযও চলতে থাকে। তার করণীয় ছিল, সে নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচাতে নামায ভেঙে মোবাইল বন্ধ করে দেব। এ কথা ভাববে না যে, আমি নামাযে থাকাবস্থায় কীভাবে বন্ধ করব?’ [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ বাদ মাগরিব, উদ্ধৃতি- অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৪৭] এই মাসআলাটি বয়ান করার ক্ষেত্রেও মাওলানা নিজের ইজতিহাদ চালিয়ে দিয়েছেন এবং ফুকাহায়ে কেরামের যাবতীয় ভাষ্য উপেক্ষা করেছেন। [বয়ানটি তিনি করেছেন ২২ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে। অর্থাৎ রুজুর পর]
৫৩. ‘এটি আলমি মারকাযের আলমি মাশওয়ারা। আলমি মাশওয়ারা আলাদা, আর আলমি মারকায আলাদা- এভাবে দুটি জিনিসকে আলাদা করার সুযোগ নেই। এমনটি করা কখনই সম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভব নয়। কেননা (নিযামুদ্দিন) বর্তমানেও আলমি মারকায হিসেবে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। [১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ বাদ মাগরিব, উদ্ধৃতি- অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৪৯] মুফতি সালমান মানসুরপুরি হাফিযাহুল্লাহ মাসিক ‘নিদায়ে শাহি’ পত্রিকায় তার এ মন্তব্যটি রদ করেছেন। ভুল সাব্যস্ত করে তিনি লিখেছেন, ‘তিনি কথাটির মাঝে সীমালঙ্ঘন করেছেন। কেননা গায়বের ইলম একমাত্র আল্লাহই জানেন।’
৫৪. মাওলানা সাদ সাহেবের মতে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের ক্ষেত্রে সমাজে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মাঝে কাজ করা (তবকাওয়ারি মেহনত) এবং তাদের একত্র করে দ্বীনি কথা আলোচনা করা সুন্নত পরিপন্থী। তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদি. এর ঘটনা দিয়ে দলিল নকরেছেন। যেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা আবাসার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সেখানে রাসূলুল্লাহ সা. -কে সতর্ক করা হয়েছিলএ মর্মে যে, কেন তিনি মুশরিকদের সর্দারদের জন্যে পৃথকভাবে সময় দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন।
৫৫. মাওলানা তার এক বয়ানে বলেছেন, ‘ইয়াকিনওয়ালাদের সঙ্গে আল্লাহর অঙ্গীকার রয়েছে।’ ‘ইয়াকিন (প্রবল বিশ্বাস) হলো প্রথম শর্ত। ইয়াকিন ছাড়া আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণ হয় না [কালিমার দাওয়াত : ২] উলামায়ে কেরাম তার এ বক্তব্যের ওপর আপত্তি তুলেছেন যে, আল্লাহ তাআলার এমন অজস্র অঙ্গীকার রয়েছে, যা স্রেফ ঈমানের অস্তিত্ব পাওয়ার ওপর পূরণ হয়েছে। কথাটি কুরআন ও হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। ইয়াকিন হলো ঈমানের অজস্র কায়ফিয়াত (অবস্থা) এর একটি। কাজেই নির্বিচারে সকল অঙ্গীকারকে শুধু এই ইয়াকিনের ওপর নির্ভরশীল করা কীভাবে শুদ্ধ?
৫৬. মাওলানা তার বিভিন্ন বয়ানে বারংবার
ﺃﺳﺒﺎﺏ [আসবাব মানে হলো, দুনিয়াবি উপকরণ ও মাধ্যম] এর নাকচ এতো বেশি পরিমাণে করে থাকেন যে, কেমন যেন তিনি পুরো উম্মতকে ‘আসবাব’ তরক করার দাওয়াত দেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘ব্যবসায়ীর মস্তিষ্কের ভেতর এ কথা রয়েছে যে, আমি দোকান বানাব। সেই দোকানে আল্লাহ সফলতা দেবেন। আমার বিস্ময় লাগে, যখন আমাদের সাথী এ কথা বলে যে, ‘ভাই, দুনিয়া দারুল আসবাব। কাজেই দোকান জরুরি। ব্যবসা জরুরি। এগুলো বানিয়ে আল্লাহর কাছে বলো যে, তিনি যেন এই উপকরণের মাঝে সফলতা ঢেলে দেন।’ এ কথা কখনই ঠিক নয়। বরং হে আমার দোস্তগণ, আসবাবের মাঝে আল্লাহর সফলতা প্রদানের নিয়ম নেই। বরং তার সফলতা তার আহকামের মাঝে।’ ‘আসবাব অবলম্বন করে আল্লাহর কাছে সফলতা প্রার্থনা করা তাওয়াক্কুল নয়। এ কথা তো বেঈমানও জানে।’
৫৭. তিনি বলেছেন, ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চিঠি ছিড়ে ফেলার কারণে কিসরা সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়েছে, এ কথা ভুল। বরং দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করার কারণে হয়েছে।’ কথাটি তিনি তামিলনাড়ুর জোড়ে বলেছেন।
সেখানকার লোক তার এ কথার সাক্ষী।
৫৮. ভারতীয় পুরনো সাথীদের জোড়ে তিনি বলেছেন, ‘ইসলামের ইতিহাসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যতগুলো আল্লাহর মদদ ও নুসরাত মুসলিমদের জন্যে এসেছে, সবগুলোর পেছনে মাশওয়ারার অবদান রয়েছে।’ অর্থাৎ মাশওয়ারার কারণে নুসরাত এসেছে।
৫৯. তিনি বারবার এ কথা বলেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় এক সালের খুরুজ ছুটে যাওয়াও অপরাধ। এ অপরাধের কারণে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। কেননা কা‘ব ইবনে মালিক রাদি.এর ওপর যেই দন্ড নেমে এসেছিল, সেই যাবতীয় জটিলতার একমাত্র কারণ হলো, তিনি যদিও সবসময় আল্লাহর রাস্তায় বের হতেন; কিন্তু শুধু ওই একবার বের হতে পারেননি। ওই একবারের খুরুজ ছুটে যাওয়ার কারণে তার ওপর দন্ড নেমে আসে।’ উলামায়ে কেরাম তার এ কথার ওপর আপত্তি তুলেছেন যে, কা‘ব ইবনে মালিক রাদি. সহ অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম রাদি. আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছিলেন ঈমানহীন লোকদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেওয়ার জন্যে। সেই ঘটনাটি এমন সময় ঘটে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে ﻧﻔﻴﺮ ﻋﺎﻡ নফিরে আম অর্থাৎ নির্বিশেষে সবাইকে কিতাল- জিহাদে অংশগ্রহণ করার নির্দেশ এসেছিল। সেই ঘটনাটিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি কীভাবে প্রয়োগ করলেন? কারণ, ওই নির্দেশ শুধুমাত্র ওই সময়কার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বিশেষায়িত ছিল। অন্যথায় এ কথা প্রমাণিত যে, অনেক অভিযানে সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর অনেকেই, কিছু কিছু অভিযানে খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অংশগ্রহণ করেননি।
৬০. গতবছর বাংলাদেশের কাকরাইলে সাথীদের মাঝে বয়ান করার সময় তিনি বলেছেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ আর চার খলিফার যুগ- এ দুটি যুগ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি পবিত্র, মুখলিস ও মুত্তাকিদের যুগ। যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম. ইরশাদ করেছেন, ﺧﻴﺮ ﺍﻟﻘﺮﻭﻥ ﻗﺮﻧﻲ । এতদসত্ত্বেও এমন কোনো মাসআলা পাওয়া যায় না, যার ওপর সেই যুগে সবাই একমত হয়েছেন। সীরাতের মাঝে এমন কোনো মাসআলা পাওয়া যায় না, যার ওপর সবার ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; বরং নবি করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইনতিকাল থেকে শুরু করে আবু বকর রাদি. এর ইমামত পর্যন্ত এমনকি উসামা রাদি. এর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ পর্যন্ত প্রতিটি মাসআলায় পরস্পরে ইখতিলাফ হয়েছে। তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে ইজমায়ে উম্মাত অস্বীকার করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যা মু‘তাযিলাদের আকিদা। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ কখনই এটাকে স্বীকার করে না।
৬১. মাওলানা সাদ সাহেব দেশের পুরনো সাথীদের জোড়ে বলেছেন, ‘ফয়সাল (অর্থাৎ আমির) এর সামনে শূরার ক্ষমতা শুধু এতটুকুই, যতটুকু মুকতাদির ক্ষমতা ইমামের পেছনে। এভাবে যে, প্রয়োজন পড়লে মুকতাদি ইমামের লুকমা দেবে। যদি ইমাম লুকমা গ্রহণ করে তাহলে ঠিক আছে। লুকমা গ্রহণ না করলে নামায ইমামের দায়িত্বে ছেড়ে দিতে হয়।’ তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, ইমাম যদি লুকমা না নেয় এবং নামায ফাসেদকারী কিরাত পড়তে থাকে তাহলে তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিতে হবে এবং নামায দোহরানো লাগবে না? মুকতাদিকে বলা হবে, ভাই, ইমামই এই নামাযের যিম্মাদার ও জামানতদার।

৬২. তার নতুন একটি বয়ান সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে যে, ‘মসজিদ, মাদরাসা বা দ্বীনের কোনো কাজে অর্থ দিলে এর মাধ্যমে দ্বীনের সাহায্য হয় না।’ ( বাতিলপন্থীরা দীর্ঘদিন যাবত এ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে, মুসলিমরা যেন এ ধরনের জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ ব্যয় না করে। আর তার পরিণতিতে দ্বীনের এই শাখাগুলো স্বয়ংক্রীয়ভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।) দীর্ঘাঙ্গিকতা এড়াতে মাওলানার বারবার উচ্চারণ করা শব্দগুলো একবার করে তুলে ধরা হলো। তিনি বলেছেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি। মনোযোগ সহকারে শোনো। আল্লাহ তাআলা শর্ত করেছেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর দিকে দাওয়াতের আমল পালন করো তাহলে আল্লাহ অন্যদের বিপরীতে তোমাদের নুসরত করবেন। আর যদি তোমরা দাওয়াতের আমলের ওপর না থাকো তাহলে আল্লাহ অন্যদের মুকাবিলায় তোমাদের নুসরত করবেন না। এটাই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত। শুধু ইবাদত করলে নুসরত আসবে না। কারণ হলো, ইবাদতের মাধ্যমে দ্বীনের নুসরত হয় না। আরো শোনো, মুসলিমদের জন্যে সম্পদ ব্যয় করাটাও ইসলামের নুসরত নয়। মানুষ সম্পদ ব্যয় করে বিধবাদের জন্যে, এতিমদের জন্যে, হতদরিদ্রদের জন্যে, মসজিদ নির্মাণের জন্যে, জনকল্যাণমূলক খাতে। তারা মনে করে, আমরা ইসলামের সহায়তা করছি। আমার কথাটি পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে। যতো মালদার আছে, তারা জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পদ ব্যয় করাকে দ্বীনের নুসরত মনে করে। পুরো পৃথিবীর সবাই এই ভুল ধারণার শিকার হয়ে আছে। মুসলমান জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পদ ব্যয় করাকে ইসলামের নুসরত মনে করে। এটি আন্তর্জাতিক ভুল ধারণা। ইসলামের জন্যে খরচ করা আর মুসলিমদের জন্যে খরচ করা― এ দুয়ের মাঝে বিশাল বড় পার্থক্য রয়েছে। ইসলামের জন্যে মাল খরচ করার কথা সীরাতের কোথাও উল্লেখ নেই। বরং সাহাবায়ে কেরাম রাদি. যত সম্পদ ব্যয় করেছেন তারা তাদের সমস্ত সম্পদ মুসলিমদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় করেছেন। বাহনও দিয়েছেন, হাতিয়ারও দিয়েছেন, খাবারও দিয়েছেন। কথাটি মনোযোগ সহকারে শোনো। সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এভাবে যত নুসরত করেছেন, তাদের সমুদয় নুসরত ছিল মুসলিমদের জন্যে। ইসলামের মদদ কী? নুসরত কী? ইসলামর নুসরত আর মুসলিমদের নুসরত- এতোদুভয়ের মাঝে ফারাক আছে। ইসলামের নুসরত হলো দাওয়াত দেওয়া। কথাটি সহজ করে বলছি, খাবারের দাওয়াত হলো মুসলিমদের নুসরত। আর দ্বীনের দাওয়াত হলো ইসলামের নুসরত। ইসলামের নুসরত হলো, আপনি দাওয়াত দিয়ে ব্যক্তিকে ইসলামের দিকে নিয়ে আসবেন। এর বিপরীতে কোনো মুসলিমের কোনো প্রয়োজন পূরণ করা, এটা হলো মুসলিমদের নুসরত।’ [১৭ ডিসেম্বর ২০১৭। বাদ ফজর, বাংলাওয়ালি মসজিদ। উদ্ধৃতি, অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান- ৩০]